নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন গতি আনতে নির্মাণাধীন ঢাকা বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প ঘিরে শুরুতে ছিল ব্যাপক প্রত্যাশা। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে উত্তরবঙ্গগামী পণ্যবাহী যানবাহনকে রাজধানী ঢাকা এড়িয়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে বাস্তবায়নাধীন এই মেগা প্রকল্পের আংশিক অংশ চালু হলেও এখন পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। বরং চালক, পরিবহন মালিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বাড়ছে অসন্তোষ।
২০২২ সালের মার্চে শুরু হওয়া ৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ চলতি বছরের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনও পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। এরই মধ্যে গাজীপুর থেকে মদনপুর পর্যন্ত প্রায় ১৮ কিলোমিটার অংশ যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে চালু হওয়ার পরও প্রত্যাশিত যানবাহনের চাপ দেখা যায়নি। অধিকাংশ চালক এখনও পুরোনো সড়ক ব্যবহার করছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, তুলনামূলক বেশি টোল, প্রয়োজনীয় র্যাম্প ও ইউ-টার্নের অভাব এবং শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ না থাকাই এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহারে অনীহার প্রধান কারণ। ফলে সময় সাশ্রয়ের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রেই পরিবহনগুলোকে অতিরিক্ত পথ ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, এক্সপ্রেসওয়ের পাশের সাধারণ লেনগুলোতে এখনও ভারী যানবাহনের দীর্ঘ সারি রয়েছে। পরিবহন সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই রুটে চলাচলকারী প্রায় ৬০ শতাংশ যানবাহন এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার না করে আগের সড়কেই চলাচল করছে।
ঢাকা বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ে টোল প্লাজার সহকারী ব্যবস্থাপক মো. সাঈদ আহমেদ বলেন, সরকার নির্ধারিত হার অনুযায়ী টোল আদায় করা হচ্ছে। তবে এক্সিট পয়েন্টগুলোর কাজ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। অবশিষ্ট কাজ শেষ হয়ে সড়কটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে যানবাহনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি জানান, বর্তমানে প্রায় ৫০ শতাংশ যানবাহন এক্সপ্রেসওয়ের বাইরে দিয়ে চলাচল করছে। ভবিষ্যতে ওয়েট মনিটরিং ব্যবস্থা চালু হলে অতিরিক্ত মালবোঝাই যানবাহনের সাধারণ সড়ক ব্যবহার সীমিত হবে, ফলে এক্সপ্রেসওয়ের ব্যবহারও বাড়বে।
ট্রাকচালক সাদেকুল ইসলাম জানান, এক্সপ্রেসওয়ের মাত্র ১৮ কিলোমিটার পথ ব্যবহার করতে একটি ট্রাকের ৬১০ টাকা টোল দিতে হয়। এর সঙ্গে কাঞ্চন সেতুর ১৩০ টাকা টোল যোগ হলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ৭৪০ টাকা। বড় যানবাহনের ক্ষেত্রে এই ব্যয় আরও বেশি।
তার ভাষ্য, পরিবহন মালিক বা ভাড়াদাতারা অতিরিক্ত টোল বহন করতে চান না। ফলে কিছুটা যানজট সহ্য করেও অনেক চালক পুরোনো সড়ক ব্যবহার করতে আগ্রহী।
পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, টোল কাঠামো পুনর্বিবেচনা না করলে প্রত্যাশিত সংখ্যক যানবাহন এক্সপ্রেসওয়েতে উঠবে না।
এক্সপ্রেসওয়ের অন্যতম সীমাবদ্ধতা হিসেবে উঠে এসেছে মীরেরবাজার এলাকায় র্যাম্প না থাকার বিষয়টি।
কাভার্ড ভ্যানচালক জুয়েল রানা বলেন, সিলেট, নরসিংদী ও গাজীপুরের কালীগঞ্জ শিল্পাঞ্চল থেকে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু মীরেরবাজারে র্যাম্প না থাকায় এসব যানবাহন সরাসরি এক্সপ্রেসওয়েতে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে, যা সময়, জ্বালানি ও অর্থের অপচয় বাড়াচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল এলাকায় সংযোগ ব্যবস্থা না থাকায় হাজারো উদ্যোক্তা ও পরিবহন ব্যবসায়ী এক্সপ্রেসওয়ের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এক্সপ্রেসওয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ১৮ কিলোমিটার অংশে কয়েকটি আন্ডারপাস থাকলেও অনেক এলাকায় নিরাপদ ও সহজ পারাপারের ব্যবস্থা নেই।
ফলে ভোগড়া, মৈরান ও মেঘডুবিসহ বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয়রা ফেনসিং ও নিরাপত্তা নেটিং কেটে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপার করছেন।
মৈরান এলাকার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন, এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের আগে রাস্তার এক পাশ থেকে অন্য পাশে যেতে পাঁচ মিনিট সময় লাগত। এখন আন্ডারপাস ব্যবহার করতে প্রায় দুই কিলোমিটার ঘুরতে হয় এবং অনেক সময় ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট পর্যন্ত লেগে যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কটি কার্যত দুই পাশের জনপদকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন কাজে অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।
এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন স্থানে ফেনসিং কেটে মানুষের পারাপার নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি একটি নিয়ন্ত্রিত গতির এক্সপ্রেসওয়ে হওয়ায় যত্রতত্র পারাপারের সুযোগ রাখা সম্ভব নয়।
মো. সাঈদ আহমেদ বলেন, অবৈধ পারাপার রোধে পেট্রোল টিম নিয়মিত টহল দিচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ওভারপাস ও আন্ডারপাস নির্মাণ করা হয়েছে। তবে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জয়দেবপুর-দেবগ্রাম-ভুলতা-মদনপুর রুটের ৪৮ কিলোমিটার সড়ককে চার লেনের এক্সপ্রেসওয়েতে উন্নীত করার কাজ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২৫ বছরের চুক্তির আওতায় প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে চীনের সিচুয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ গ্রুপ, শামীম এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড এবং ইউডিসি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ঢাকা বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ে ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর ওপর যানবাহনের চাপ কমানো এবং চট্টগ্রাম বন্দর থেকে উত্তরবঙ্গগামী পণ্য পরিবহনে গতি আনাই প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য। তবে পূর্ণাঙ্গ র্যাম্প, সংযোগ সড়ক, নিরাপদ পারাপার ব্যবস্থা এবং বাস্তবসম্মত টোল কাঠামো নিশ্চিত না হলে সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবহন মালিক ও চালকদের দাবি, দ্রুত অবশিষ্ট নির্মাণকাজ শেষ করা, শিল্পাঞ্চলসংলগ্ন এলাকায় প্রয়োজনীয় র্যাম্প নির্মাণ, টোল হার পুনর্বিবেচনা এবং নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে ঢাকা বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ে দেশের অন্যতম কার্যকর সড়ক অবকাঠামো হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে। অন্যথায় বহু কোটি টাকার এই প্রকল্পের প্রত্যাশিত সুফল সাধারণ মানুষ ও পরিবহন খাতের কাছে অধরাই থেকে যাবে।